যুক্তরাষ্ট্রের স্টুডেন্ট ভিসা (F-1): আবেদনের সম্পূর্ণ গাইড বাংলাদেশিদের জন্য
I-20 পাওয়া থেকে SEVIS ফি, DS-160 ফরম, ইন্টারভিউ ও ভিসা হাতে পাওয়া পর্যন্ত — যুক্তরাষ্ট্রের F-1 স্টুডেন্ট ভিসার প্রতিটি ধাপের সহজ বাংলা গাইড।
সূচিপত্র দেখুন
সংক্ষিপ্ত উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার মূল ভিসা হলো F-1। ধাপগুলো: SEVP-অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে I-20 ফরম নিন → SEVIS ফি দিন → DS-160 ফরম পূরণ করুন → ভিসা ফি দিয়ে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে ইন্টারভিউয়ের তারিখ নিন → কাগজপত্রসহ ইন্টারভিউ দিন। পুরো প্রক্রিয়ায় ভর্তি থেকে ভিসা পর্যন্ত সাধারণত ৩–৬ মাস ধরা উচিত।
F-1 ভিসা কী?
F-1 হলো যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী ভিসা — ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পিএইচডি কিংবা ভাষা কোর্সের জন্য। ভিসাটি "নন-ইমিগ্র্যান্ট", অর্থাৎ ধরে নেওয়া হয় পড়াশোনা শেষে আপনি দেশে ফিরবেন — ইন্টারভিউতে এই বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্ব পায়।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
- SEVP-অনুমোদিত কোনো মার্কিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভর্তির নিশ্চয়তা (I-20) পেয়েছেন
- পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার খরচ বহনের বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক প্রমাণ দেখাতে পারবেন
- ইংরেজিতে পড়াশোনা চালানোর মতো দক্ষতা আছে
- পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার যৌক্তিক কারণ (পারিবারিক, পেশাগত বা সম্পত্তিগত বন্ধন) দেখাতে পারবেন
কী কী কাগজপত্র লাগবে?
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- বৈধ পাসপোর্ট (যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর অন্তত ৬ মাস মেয়াদ থাকা নিরাপদ)
- বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া মূল I-20 ফরম (আপনার সই করা)
- SEVIS I-901 ফি জমার রসিদ
- DS-160 কনফার্মেশন পেজ (বারকোডসহ)
- ভিসা ফি (MRV) জমার রসিদ ও ইন্টারভিউ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার
- শিক্ষাগত সনদ ও ট্রান্সক্রিপ্ট (এসএসসি থেকে সর্বশেষ ডিগ্রি)
- IELTS/TOEFL/GRE স্কোর (যা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিয়েছেন)
- আর্থিক প্রমাণ: ব্যাংক স্টেটমেন্ট/সলভেন্সি, স্পনসরের আয়ের প্রমাণ, স্কলারশিপ লেটার
- স্পনসর বাবা-মা হলে সম্পর্কের প্রমাণ (জন্মসনদ) ও তাদের আয়ের কাগজ
আবেদনের ধাপগুলো
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে I-20 সংগ্রহ করুন
আগে ভর্তি, পরে ভিসা — এই ক্রম বদলানো যায় না। ভর্তি নিশ্চিত হয়ে টিউশন ডিপোজিট (যেখানে প্রযোজ্য) দিলে বিশ্ববিদ্যালয় ইমেইলে বা কুরিয়ারে I-20 পাঠাবে। ফরমের নাম-জন্মতারিখ পাসপোর্টের সঙ্গে হুবহু মিলছে কি না প্রথমেই যাচাই করুন — ভুল থাকলে সংশোধিত I-20 চেয়ে নিন।
SEVIS I-901 ফি জমা দিন
fmjfee.com-এ গিয়ে I-20-এর SEVIS নম্বর দিয়ে ফি জমা দিন (আন্তর্জাতিক কার্ডে)। রসিদটি প্রিন্ট করুন — ইন্টারভিউতে লাগবে। এই ফি ভিসা ফি থেকে আলাদা এবং রিফিউজ হলেও ফেরত পাওয়া যায় না।
DS-160 ফরম পূরণ করুন
ceac.state.gov-এ DS-160 অনলাইন ফরম পূরণ করুন — শিক্ষা, পরিবার, ভ্রমণ ইতিহাস, সোশ্যাল মিডিয়া তথ্যসহ। প্রতিটি উত্তর সত্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে; ইন্টারভিউতে অফিসার এই ফরম সামনে রেখেই প্রশ্ন করেন। শেষে কনফার্মেশন পেজটি সংরক্ষণ করুন।
ভিসা ফি দিয়ে ইন্টারভিউয়ের তারিখ নিন
বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পোর্টালে প্রোফাইল খুলে MRV ফি জমা দিন এবং ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে ইন্টারভিউয়ের তারিখ বুক করুন। ভরা মৌসুমে (মে–আগস্ট) সিরিয়াল দূরে চলে যায় — I-20 পাওয়ামাত্র বুক করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি নিন
কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়, কেন এই বিষয়, খরচ কে দেবে, পাস করে কী করবেন — এই চারটি প্রশ্নের সৎ, গোছানো উত্তরই ইন্টারভিউয়ের মেরুদণ্ড। বিস্তারিত প্রস্তুতির জন্য পড়ুন আমাদের F-1 ভিসা ইন্টারভিউ প্রস্তুতি গাইড।
ইন্টারভিউ দিন ও পাসপোর্ট ফেরত নিন
নির্ধারিত দিনে সব মূল কাগজ নিয়ে দূতাবাসে যান। ইন্টারভিউ সাধারণত ২–৫ মিনিটের, ইংরেজিতে। অনুমোদন হলে পাসপোর্ট ভিসাসহ কুরিয়ারে ফেরত আসে — সাধারণত কয়েক কর্মদিবসে, তবে "অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসেসিং"-এ পড়লে কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে।
খরচ কেমন?
ভিসা-সংক্রান্ত মূল খরচ দুটি — SEVIS ফি ও ভিসা আবেদন (MRV) ফি; সঙ্গে যোগ হয় পরীক্ষা, কাগজপত্র ও যাতায়াতের আনুষঙ্গিক খরচ। অঙ্কসহ বিস্তারিত ভাঙচুর দেখুন যুক্তরাষ্ট্রের স্টুডেন্ট ভিসার খরচ লেখায়।
কত সময় লাগে?
| ধাপ | সাধারণ সময় |
|---|---|
| ভর্তি ও I-20 | ২–৮ সপ্তাহ (বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে) |
| SEVIS ফি ও DS-160 | ১–৩ দিন |
| ইন্টারভিউয়ের সিরিয়াল | কয়েক সপ্তাহ – কয়েক মাস (মৌসুমভেদে) |
| ইন্টারভিউর পর পাসপোর্ট ফেরত | সাধারণত ১–২ সপ্তাহ |
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়
- এজেন্টের বানানো ব্যাংক স্টেটমেন্ট — ধরা পড়লে স্থায়ীভাবে ভিসা-অযোগ্য হওয়ার ঝুঁকি
- DS-160 আর ইন্টারভিউয়ের উত্তরে গরমিল
- শেষ মুহূর্তে আবেদন — সিরিয়াল না পেয়ে সেমিস্টার পেছানো
- শুধু মুখস্থ উত্তর — অফিসার স্ক্রিপ্ট ধরে ফেললে বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
F-1 ভিসার জন্য কি IELTS বাধ্যতামূলক?
ভিসার জন্য সরাসরি বাধ্যতামূলক নয় — ভাষার শর্ত ঠিক করে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ইন্টারভিউতে আপনাকে ইংরেজিতেই কথা বলতে হবে, তাই ভালো ইংরেজি দক্ষতা কার্যত অপরিহার্য। অধিকাংশ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় IELTS, TOEFL বা Duolingo English Test গ্রহণ করে।
I-20 কী এবং কে দেয়?
I-20 হলো ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সরকারি ফরম, যাতে আপনার কোর্স, খরচ ও SEVIS নম্বর লেখা থাকে। এই ফরম ছাড়া F-1 ভিসার আবেদনই করা যায় না — তাই আগে ভর্তি, পরে ভিসা।
ভিসা রিফিউজ হলে কি আবার আবেদন করা যায়?
যায়। রিফিউজালের নির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা-মেয়াদ নেই — তবে আগের দুর্বলতা (আর্থিক প্রমাণ, দেশে ফেরার বন্ধন, অস্পষ্ট পড়াশোনার পরিকল্পনা) না শুধরে আবেদন করলে ফলাফল একই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রতিবার নতুন করে ফি দিতে হয়।
F-1 ভিসায় কি পার্টটাইম কাজ করা যায়?
প্রথম শিক্ষাবর্ষে শুধু ক্যাম্পাসের ভেতরে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজের অনুমতি থাকে। ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করতে হলে CPT বা OPT-এর মতো আলাদা অনুমোদন লাগে — নিয়ম ভাঙলে ভিসা বাতিলের ঝুঁকি আছে।
কখন ভিসার আবেদন শুরু করা উচিত?
I-20 হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। নিয়ম অনুযায়ী কোর্স শুরুর ৩৬৫ দিন আগে পর্যন্ত ভিসা ইস্যু হতে পারে। ঢাকায় ইন্টারভিউয়ের সিরিয়াল পেতে অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লেগে যায়, তাই দেরি করা মানেই ঝুঁকি।
তথ্যসূত্র ও আইনি রেফারেন্স
আরও পড়ুন
লেখাটি শেয়ার করুন, লেখকের পরিচয় দেখুন এবং একই বিষয়ের আরও গাইড পড়ুন।
লেখকের পরিচিতি

লেখক
শান্ত ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক · এলএল.বি — BAUET · এলএল.এম — BUP
শান্ত ইসলাম বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BAUET) থেকে এলএল.বি এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে এলএল.এম সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের আইন, সরকারি সেবা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সহজ বাংলায় লেখালেখি করেন — লক্ষ্য একটাই, জটিল আইনি বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলা।
সম্পর্কিত
সম্পর্কিত লেখা
একই বিষয়ের দরকারি গাইড
F-1 ভিসা ইন্টারভিউ: কী প্রশ্ন করে, কীভাবে উত্তর দেবেন
ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে F-1 স্টুডেন্ট ভিসা ইন্টারভিউতে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন, উত্তরের কৌশল, কী নেবেন আর কোন ভুলে ভিসা রিফিউজ হয় — পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টুডেন্ট ভিসার খরচ কত? ফি থেকে ব্যাংক ব্যালেন্স — পুরো হিসাব
SEVIS ফি, ভিসা আবেদন ফি, IELTS/TOEFL, কাগজপত্র ও আনুষঙ্গিক — যুক্তরাষ্ট্রের F-1 স্টুডেন্ট ভিসা পেতে মোট কত টাকা লাগে এবং ব্যাংকে কত দেখাতে হয়, টাকার অঙ্কে পূর্ণ হিসাব।
ই-পাসপোর্ট করতে কী কী লাগে? আবেদন থেকে হাতে পাওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ গাইড
ই-পাসপোর্টের অনলাইন আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং পাসপোর্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সহজ ব্যাখ্যা।
অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা (Subclass 500): CoE, GS ও আর্থিক প্রমাণসহ পূর্ণ গাইড
অস্ট্রেলিয়ার সাবক্লাস ৫০০ স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন — CoE, Genuine Student (GS) রিকোয়ারমেন্ট, আর্থিক সামর্থ্য, OSHC স্বাস্থ্যবিমা ও ImmiAccount-এ আবেদনের প্রতিটি ধাপ সহজ বাংলায়।
কানাডার স্টাডি পারমিট: LOA, PAL ও আর্থিক প্রমাণসহ আবেদনের সম্পূর্ণ নিয়ম
কানাডায় পড়তে স্টাডি পারমিটের আবেদন কীভাবে করবেন — DLI থেকে ভর্তি, প্রভিন্সিয়াল অ্যাটেস্টেশন লেটার (PAL), আর্থিক প্রমাণ, বায়োমেট্রিক ও প্রসেসিং সময়ের পূর্ণ গাইড।
যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসা: CAS থেকে ভিসা হাতে পাওয়া পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ গাইড
যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য CAS, ২৮ দিনের ব্যাংক ব্যালেন্স নিয়ম, IHS ফি, IELTS UKVI ও অনলাইন আবেদনের প্রতিটি ধাপ — বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ বাংলায়।