ই-পাসপোর্ট করতে কী কী লাগে? আবেদন থেকে হাতে পাওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ গাইড
ই-পাসপোর্টের অনলাইন আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং পাসপোর্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সহজ ব্যাখ্যা।
সূচিপত্র দেখুন
সংক্ষিপ্ত উত্তর: ই-পাসপোর্ট করতে লাগে — epassport.gov.bd-তে অনলাইন আবেদন, জাতীয় পরিচয়পত্র (১৮ বছরের কম হলে জন্ম নিবন্ধন), ব্যাংক বা অনলাইনে ফি জমার রসিদ, আর নির্ধারিত দিনে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া। দালাল ছাড়াই পুরো কাজটি নিজে করা যায়।
ই-পাসপোর্ট কী?
ই-পাসপোর্ট (ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট) হলো চিপযুক্ত আধুনিক পাসপোর্ট — ভেতরের ইলেকট্রনিক চিপে আপনার ছবি, ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ পরিচয়ের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশে ২০২০ সাল থেকে ই-পাসপোর্ট চালু হয়েছে এবং এখন নতুন সব পাসপোর্টই ই-পাসপোর্ট হিসেবে ইস্যু হয়।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন — বয়সের কোনো নিম্নসীমা নেই, নবজাতকের জন্যও আবেদন করা যায়। তবে বয়স অনুযায়ী কাগজপত্র ও পাসপোর্টের মেয়াদে পার্থক্য আছে।
কী কী কাগজপত্র লাগবে?
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- জাতীয় পরিচয়পত্র — NID (১৮ বছরের বেশি হলে বাধ্যতামূলক)
- অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ — BRC (১৮ বছরের কম হলে)
- অভিভাবকের এনআইডির কপি (অপ্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে)
- ফি জমার রসিদ বা অনলাইন পেমেন্টের প্রমাণ
- পুরনো পাসপোর্ট (থাকলে — নবায়নের ক্ষেত্রে)
- পেশাগত প্রমাণপত্র (সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে NOC/GO)
আবেদনের ধাপগুলো
অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করুন
epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে Apply Online অপশনে ক্লিক করুন। বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী আপনার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করুন, ইমেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন এবং ফরমের প্রতিটি ঘর সাবধানে পূরণ করুন। কোনো কাগজ সত্যায়িত করার দরকার নেই।
পাসপোর্টের ধরন ও ডেলিভারি বাছাই করুন
৪৮ বা ৬৪ পৃষ্ঠা এবং ৫ বা ১০ বছর মেয়াদ — এই দুই সিদ্ধান্তের ওপর ফি নির্ভর করে। ঘন ঘন বিদেশ যান না এমন সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য ৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর মেয়াদই যথেষ্ট।
ফি জমা দিন
অনলাইনে (বিকাশ, নগদ, রকেট, কার্ড) অথবা নির্ধারিত ব্যাংকে ফি জমা দেওয়া যায়। রসিদ বা ট্রানজেকশন নম্বর সংরক্ষণ করুন — অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন লাগবে।
নির্ধারিত দিনে পাসপোর্ট অফিসে যান
আবেদন শেষে অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ পাবেন। সেদিন আবেদনের প্রিন্ট কপি, ফি-র রসিদ ও মূল কাগজপত্র নিয়ে অফিসে যান। সেখানে ছবি তোলা, দশ আঙুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও চোখের আইরিশ স্ক্যান হবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হতে দিন
আপনার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে। তথ্য সঠিক থাকলে ভয়ের কিছু নেই — বাড়তি কোনো টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এসএমএস পেলে পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন
পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে এসএমএস পাবেন। ডেলিভারি স্লিপ ও এনআইডি নিয়ে নিজে গিয়ে পাসপোর্ট নিন। অনলাইনে Check Status থেকেও অগ্রগতি দেখা যায়।
ফি কত?
ফি নির্ভর করে পৃষ্ঠা সংখ্যা, মেয়াদ ও ডেলিভারির গতির ওপর। নিচের তালিকাটি সাধারণ ধারণার জন্য:
| পাসপোর্ট | রেগুলার | এক্সপ্রেস | সুপার এক্সপ্রেস |
|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ বছর | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা, ১০ বছর | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
কত দিনে পাসপোর্ট পাবেন?
- রেগুলার: সাধারণত ১৫–২১ কর্মদিবস
- এক্সপ্রেস: ৭–১০ কর্মদিবস
- সুপার এক্সপ্রেস: ২ কর্মদিবস (বায়োমেট্রিকের পর)
পুলিশ ভেরিফিকেশন বা তথ্যের গরমিলে সময় বাড়তে পারে — তাই ভ্রমণের তারিখ ঠিক হওয়ার অনেক আগেই আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- এনআইডির সঙ্গে অমিল রেখে ফরম পূরণ করা — সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে সাধারণ ভুল
- একাধিকবার অনলাইন আবেদন করা — আগের আবেদন বাতিল না করে নতুন আবেদন করলে জটিলতা হয়
- দালালের হাতে টাকা ও কাগজ তুলে দেওয়া
- অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন মূল কাগজপত্র না নেওয়া
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
ই-পাসপোর্ট করতে মোট কত দিন লাগে?
ডেলিভারির ধরন অনুযায়ী সাধারণত ২ থেকে ২১ কর্মদিবস। রেগুলার ডেলিভারিতে ১৫–২১ কর্মদিবস, এক্সপ্রেসে ৭–১০ কর্মদিবস এবং সুপার এক্সপ্রেসে ২ কর্মদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশনে দেরি হলে সময় বাড়তে পারে।
পাসপোর্ট করতে কি দালাল ধরতে হয়?
না। ই-পাসপোর্টের পুরো আবেদন অনলাইনে নিজে করা যায় এবং ফি ব্যাংক বা অনলাইনে জমা দেওয়া যায়। দালালের মাধ্যমে গেলে খরচ বাড়ে এবং প্রতারণার ঝুঁকি থাকে।
এনআইডি না থাকলে কি পাসপোর্ট করা যায়?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক। ১৮ বছরের কম বয়সীরা অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC) দিয়ে আবেদন করতে পারে, সঙ্গে বাবা-মায়ের এনআইডি লাগে।
পুরনো এমআরপি পাসপোর্ট থাকলে কী করব?
নতুন আবেদনের সময় পুরনো পাসপোর্টের তথ্য দিতে হবে এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার দিন পুরনো পাসপোর্টটি সঙ্গে নিতে হবে। ই-পাসপোর্ট ইস্যুর সময় পুরনোটি বাতিল করে ফেরত দেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র ও আইনি রেফারেন্স
- ই-পাসপোর্ট অনলাইন পোর্টাল — ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর
- বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩
আরও পড়ুন
লেখাটি শেয়ার করুন, লেখকের পরিচয় দেখুন এবং একই বিষয়ের আরও গাইড পড়ুন।
লেখকের পরিচিতি

লেখক
শান্ত ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক · এলএল.বি — BAUET · এলএল.এম — BUP
শান্ত ইসলাম বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BAUET) থেকে এলএল.বি এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে এলএল.এম সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের আইন, সরকারি সেবা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সহজ বাংলায় লেখালেখি করেন — লক্ষ্য একটাই, জটিল আইনি বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলা।
সম্পর্কিত
সম্পর্কিত লেখা
একই বিষয়ের দরকারি গাইড
পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজপত্র লাগে? বয়স ও পেশাভেদে পূর্ণ তালিকা
প্রাপ্তবয়স্ক, শিশু, সরকারি চাকরিজীবী, বিবাহিত — কার ক্ষেত্রে ই-পাসপোর্টের জন্য কোন কোন কাগজ লাগে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও সাধারণ ভুলগুলোর সমাধান।
পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে? ই-পাসপোর্ট ফির সম্পূর্ণ তালিকা
৪৮ ও ৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ ও ১০ বছর মেয়াদ, রেগুলার-এক্সপ্রেস-সুপার এক্সপ্রেস — ই-পাসপোর্টের সব ফির তালিকা, অনলাইনে ও ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার নিয়ম এক লেখায়।
পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক করার নিয়ম — আবেদন এখন কোন ধাপে?
ই-পাসপোর্ট আবেদনের বর্তমান অবস্থা অনলাইনে দেখার নিয়ম — Application ID/OID দিয়ে চেক, প্রতিটি স্ট্যাটাসের মানে কী এবং কোন ধাপে আটকে থাকলে কী করবেন।
পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন: কী হয়, কত দিন লাগে, টাকা লাগে কি?
পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশনে কী যাচাই হয়, বাড়িতে কে আসে, কত দিন লাগে, টাকা চাইলে কী করবেন এবং ভেরিফিকেশন নেগেটিভ হলে করণীয় — সব প্রশ্নের উত্তর।
পাসপোর্ট নবায়ন (রি-ইস্যু) করার নিয়ম — মেয়াদ শেষের আগেই যা করবেন
ই-পাসপোর্ট নবায়ন বা রি-ইস্যুর অনলাইন আবেদন, পুরনো এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে যাওয়ার নিয়ম, ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কত দিন আগে আবেদন করা উচিত — পূর্ণাঙ্গ গাইড।
অনলাইনে ই-টিআইএন খোলার নিয়ম — কাদের লাগে, কীভাবে করবেন
ঘরে বসে বিনামূল্যে ই-টিআইএন সার্টিফিকেট খোলার ধাপে ধাপে নিয়ম — কাদের টিআইএন লাগে, কী কী তথ্য দরকার এবং টিআইএন থাকলে রিটার্ন দিতে হয় কি না।