নামজারি (মিউটেশন) করার নিয়ম: ই-নামজারির আবেদন, খরচ ও সময়
জমি কেনা বা ওয়ারিশসূত্রে পাওয়ার পর নামজারি কেন বাধ্যতামূলক — ই-নামজারির অনলাইন আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজ, সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা, শুনানি ও খতিয়ান পাওয়ার পূর্ণ প্রক্রিয়া।
সূচিপত্র দেখুন
সংক্ষিপ্ত উত্তর: জমি কেনা, ওয়ারিশ বা দানসূত্রে পাওয়ার পর সরকারি খতিয়ানে নিজের নাম ওঠানোই নামজারি (মিউটেশন)। আবেদন এখন সম্পূর্ণ অনলাইনে — mutation.land.gov.bd-তে; সরকারি খরচ মোট ১,১৭০ টাকা, নির্ধারিত সময়সীমা ২৮ কর্মদিবস। শেষে পাবেন ডিসিআর ও নতুন খতিয়ান — দুটোই অনলাইনে।
নামজারি কী, কেন এত জরুরি?
দলিল রেজিস্ট্রি করলেই কাজ শেষ — এই ভুল ধারণাই বাংলাদেশের জমি-বিরোধের বড় উৎস। দলিল আপনাকে মালিক বানায়, কিন্তু সরকারের রেকর্ড (খতিয়ান) হালনাগাদ হয় নামজারিতে। রেকর্ডে নাম না থাকলে:
- ভূমি উন্নয়ন কর নিজের নামে দিতে পারবেন না
- বিক্রি বা ব্যাংকে মর্টগেজ আটকে যাবে
- প্রতারক আগের রেকর্ড দেখিয়ে জমি আবার বিক্রির সুযোগ পায়
কী কী কাগজ লাগবে?
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- মূল দলিলের কপি (সাফ কবলা/হেবা/বণ্টননামা — যেভাবে মালিক হয়েছেন)
- সর্বশেষ খতিয়ানের কপি (আগের মালিকের নামের)
- ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা (হালনাগাদ)
- আবেদনকারীর এনআইডি ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- ওয়ারিশসূত্রে হলে: ওয়ারিশান সনদ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা
- বায়া দলিল (মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখাতে — চাওয়া হলে)
ই-নামজারির ধাপগুলো
অনলাইনে আবেদন করুন
mutation.land.gov.bd-তে গিয়ে জেলা-উপজেলা-মৌজা নির্বাচন করে ফরম পূরণ করুন এবং কাগজপত্রের স্ক্যান কপি আপলোড করুন। আবেদন ফি (কোর্ট ফি ২০ + নোটিশ জারি ৫০ টাকা) অনলাইনে দিন। আবেদন নম্বরটি সংরক্ষণ করুন — অগ্রগতি ট্র্যাক করতে লাগবে।
তদন্ত ও নোটিশের অপেক্ষা করুন
আবেদন যায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) — এসিল্যান্ড অফিসে; ইউনিয়ন ভূমি অফিস সরেজমিন প্রতিবেদন দেয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষদের নোটিশ পাঠানো হয়। আপনার মোবাইলে এসএমএসে শুনানির তারিখ আসবে।
শুনানিতে মূল কাগজসহ হাজির হোন
নির্ধারিত দিনে মূল দলিল, খতিয়ান, দাখিলা ও এনআইডি নিয়ে এসিল্যান্ড অফিসে যান। কেউ আপত্তি করলে দুই পক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত হয় — কাগজ নির্ভুল থাকলে ভয়ের কিছু নেই।
ডিসিআর ফি দিয়ে খতিয়ান নিন
আবেদন মঞ্জুর হলে রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা ও খতিয়ান ফি ১০০ টাকা অনলাইনে দিন — ডিসিআর (DCR) ও নতুন খতিয়ান অনলাইনেই পাবেন, QR কোডসহ প্রিন্টযোগ্য। এরপর থেকে ভূমি উন্নয়ন কর দেবেন নিজের নামে।
আবেদন নামঞ্জুর হলে?
নামঞ্জুরের কারণ আদেশে লেখা থাকে। প্রতিকার তিন স্তরে: এসিল্যান্ডের আদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল, এরপর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব)-এর কাছে রিভিশন — নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে করতে হয়। কাগজের ঘাটতিতে নামঞ্জুর হলে ঘাটতি পূরণ করে নতুন আবেদনও করা যায়। জমির রেকর্ড আগে যাচাই করতে শিখুন খতিয়ান ও পর্চা তোলার নিয়মে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
নামজারি না করলে কী সমস্যা?
সরকারি রেকর্ডে জমি আগের মালিকের নামেই থেকে যায় — ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া, জমি বিক্রি, ব্যাংক ঋণ (মর্টগেজ), এমনকি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়াও আটকে যায়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: আগের মালিক একই জমি আবার বিক্রি করলে আইনি লড়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
নামজারির সরকারি খরচ আসলে কত?
সব মিলিয়ে ১,১৭০ টাকা — আবেদন কোর্ট ফি ২০, নোটিশ জারি ৫০, রেকর্ড সংশোধন ১,০০০ ও খতিয়ান সরবরাহ ফি ১০০ টাকা। পুরোটাই অনলাইনে দেওয়া যায়। এর বেশি যে-ই চাক, সেটা ঘুষ — ফির হার বদলেছে কি না land.gov.bd-তে দেখে নিন।
নামজারি হতে কত দিন লাগে?
সাধারণ ক্ষেত্রে সরকার-নির্ধারিত সময়সীমা ২৮ কর্মদিবস। প্রবাসী ও কিছু বিশেষ শ্রেণির জন্য দ্রুততর নিষ্পত্তির নিয়ম আছে। কাগজ অসম্পূর্ণ থাকলে বা আপত্তি উঠলে সময় বাড়ে।
দলিল আছে কিন্তু দখল নেই — নামজারি হবে?
নামজারি মালিকানার রেকর্ড হালনাগাদ করে, দখলের বিরোধ মেটায় না। শুনানিতে আপত্তি উঠলে এসিল্যান্ড নথিপত্র দেখে সিদ্ধান্ত দেবেন; জটিল মালিকানা-বিরোধ থাকলে দেওয়ানি আদালতই শেষ ভরসা।
ওয়ারিশসূত্রে জমির নামজারিতে কী বাড়তি লাগে?
ওয়ারিশান সনদ (ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা থেকে) এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা (ফারায়েজ অনুযায়ী)। সব ওয়ারিশ মিলে আবেদন করা সবচেয়ে নিরাপদ — কাউকে বাদ দিলে পরে আপত্তিতে আটকে যায়।
তথ্যসূত্র ও আইনি রেফারেন্স
আরও পড়ুন
লেখাটি শেয়ার করুন, লেখকের পরিচয় দেখুন এবং একই বিষয়ের আরও গাইড পড়ুন।
লেখকের পরিচিতি

লেখক
শান্ত ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক · এলএল.বি — BAUET · এলএল.এম — BUP
শান্ত ইসলাম বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BAUET) থেকে এলএল.বি এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে এলএল.এম সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের আইন, সরকারি সেবা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সহজ বাংলায় লেখালেখি করেন — লক্ষ্য একটাই, জটিল আইনি বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলা।
সম্পর্কিত
সম্পর্কিত লেখা
একই বিষয়ের দরকারি গাইড
খতিয়ান ও পর্চা অনলাইনে তোলার নিয়ম — সিএস, এসএ, আরএস, বিএস কোনটা কী?
ঘরে বসে eporcha.gov.bd থেকে খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি তোলার ধাপ, সিএস-এসএ-আরএস-বিএস খতিয়ানের পার্থক্য, ফি ও জমি কেনার আগে রেকর্ড যাচাইয়ের চেকলিস্ট।
মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের নিয়ম — কাবিননামা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন কীভাবে হয়, কাজী অফিসের ফি কত, কাবিননামায় কী লেখা থাকে এবং নিবন্ধন না করলে কী ঝুঁকি — সহজ বাংলায় পূর্ণাঙ্গ গাইড।