মুসলিম আইনে তালাকের নিয়ম: নোটিশ, ৯০ দিন ও নিবন্ধন — পূর্ণ প্রক্রিয়া
স্বামী বা স্ত্রী — কে কীভাবে তালাক দিতে পারেন, চেয়ারম্যানকে নোটিশ কেন বাধ্যতামূলক, ৯০ দিনের হিসাব, তালাক নিবন্ধন ও তালাকের পর দেনমোহর-ভরণপোষণের অধিকার।
সূচিপত্র দেখুন
সংক্ষিপ্ত উত্তর: বাংলাদেশে মুসলিম তালাকের আইনি প্রক্রিয়া তিন ধাপের — (১) তালাক ঘোষণার পর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান/পৌর মেয়র/সিটি কাউন্সিলরকে লিখিত নোটিশ, স্ত্রীকে কপি; (২) চেয়ারম্যানের সালিশি পরিষদে সমঝোতার চেষ্টা; (৩) নোটিশের ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর। নোটিশ না দিলে তালাক কার্যকর হয় না এবং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কার্যকর হওয়ার পর তালাক নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে নিবন্ধন করিয়ে সনদ নিন।
আইনটা আগে বুঝুন
তালাক ব্যক্তিগত ঘোষণায় শেষ হয় না — মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৭ পুরো প্রক্রিয়াকে নোটিশ ও সময়সীমায় বেঁধেছে। উদ্দেশ্য দুটি: হুটহাট তালাক ঠেকানো আর সমঝোতার শেষ সুযোগ রাখা। এ নিয়ম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দেওয়া তালাকেই প্রযোজ্য।
কে, কোন পথে তালাক দিতে পারেন?
| কে | পথ | ভিত্তি |
|---|---|---|
| স্বামী | নোটিশ-পদ্ধতিতে তালাক | ১৯৬১ অধ্যাদেশ, ধারা ৭ |
| স্ত্রী (কাবিনে ক্ষমতা থাকলে) | তালাক-ই-তাওফিজ — একই নোটিশ-পদ্ধতি | কাবিননামার ১৮ নং কলাম |
| স্ত্রী (ক্ষমতা না থাকলে) | পারিবারিক আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা | ১৯৩৯ সালের আইন |
| উভয়ের সম্মতিতে | খুলা / মুবারাত — লিখিত চুক্তি, তারপর একই নোটিশ | প্রচলিত মুসলিম আইন |
তালাকের ধাপগুলো
তালাক ঘোষণা ও লিখিত নোটিশ
তালাক ঘোষণার পর যত দ্রুত সম্ভব স্ত্রীর (বা স্বামীর) বসবাসের এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান / পৌরসভার মেয়র / সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর বরাবর লিখিত নোটিশ পাঠান — ডাকযোগে প্রাপ্তিস্বীকারসহ (এডি) পাঠিয়ে রসিদ রাখুন। স্ত্রীকেও নোটিশের কপি দিতে হবে। নোটিশে থাকবে: দুই পক্ষের নাম-ঠিকানা, বিয়ের তারিখ ও তালাক ঘোষণার তারিখ।
সালিশি পরিষদে সমঝোতার চেষ্টা
নোটিশ পেয়ে চেয়ারম্যান ৩০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠন করবেন। হাজির হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে সমঝোতার সত্যিকার সুযোগ থাকলে কাজে লাগান — এই ধাপেই বহু সংসার টিকে যায়।
৯০ দিনের অপেক্ষা
নোটিশ দেওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন পূর্ণ হলে তালাক কার্যকর হয় (স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে — গর্ভাবস্থা শেষ হওয়া পর্যন্ত, যেটি পরে ঘটে)। মাঝে নোটিশ প্রত্যাহার করলে তালাক আর কার্যকর হয় না।
তালাক নিবন্ধন করুন
কার্যকর হওয়ার পর নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) কাছে তালাক নিবন্ধন করিয়ে তালাকনামার সার্টিফাইড কপি নিন — ভবিষ্যতের বিয়ে, বিদেশযাত্রা বা আইনি প্রয়োজনে এটিই প্রমাণ। নিবন্ধনের নির্ধারিত ফি আছে; রসিদ নিন।
পাওনা-দেনা মিটিয়ে নিন
অপরিশোধিত দেনমোহর ও ইদ্দতের ভরণপোষণ পরিশোধ করুন/আদায় করুন এবং সন্তানের হেফাজত-ভরণপোষণের বিষয়ে লিখিত সমঝোতা করুন। আদায় না হলে পারিবারিক আদালতে মামলার পথ খোলা — বিস্তারিত: দেনমোহরের অধিকার ও ভরণপোষণের নিয়ম।
নোটিশ না দিলে কী হয়?
- তালাক আইনত কার্যকরই হয় না — অর্থাৎ পরের বিয়ে বহুবিবাহ/অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ে
- ধারা ৭ লঙ্ঘনে সাজা: বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়
- স্ত্রী ভরণপোষণ ও অন্যান্য অধিকার দাবি চালিয়ে যেতে পারেন
খরচ কেমন?
নোটিশ পাঠানো (ডাক খরচ) নামমাত্র; তালাক নিবন্ধনে কাজীর সরকার-নির্ধারিত ফি; আদালতের মামলায় (১৯৩৯ আইনে) কোর্ট ফি ও আইনজীবীর খরচ। সরকারি লিগ্যাল এইড (জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা, হটলাইন ১৬৪৩০) থেকে অসচ্ছলরা বিনা খরচে আইনজীবী পেতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
মুখে তিন তালাক বললেই কি তালাক হয়ে যায়?
না। বাংলাদেশের আইনে মুখে যত বারই বলা হোক, চেয়ারম্যান/মেয়রকে লিখিত নোটিশ না দিলে এবং নোটিশের ৯০ দিন না পেরোলে তালাক কার্যকর হয় না। নোটিশ ছাড়া 'তালাক' আইনের চোখে অসম্পূর্ণ — আর নোটিশ না দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধও।
স্ত্রী কি তালাক দিতে পারেন?
পারেন — দুই পথে। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী ক্ষমতা অর্পণ করলে (তালাক-ই-তাওফিজ) স্ত্রী নিজেই একই নোটিশ-পদ্ধতিতে তালাক দিতে পারেন। ক্ষমতা দেওয়া না থাকলে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর নির্দিষ্ট কারণে পারিবারিক আদালতে ডিক্রির মামলা করতে পারেন।
তালাকের পর স্ত্রী কী কী পাবেন?
অপরিশোধিত সম্পূর্ণ দেনমোহর, ইদ্দতকালের (সাধারণত ৯০ দিন) ভরণপোষণ এবং সন্তান স্ত্রীর হেফাজতে থাকলে সন্তানের ভরণপোষণ — এগুলো আইনি পাওনা, 'দয়া' নয়। আদায় না হলে পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়।
৯০ দিনের মধ্যে মিলমিশ হয়ে গেলে?
নোটিশ প্রত্যাহার করলেই সংসার আগের মতো চলবে — তালাক কার্যকর হয় না। ৯০ দিনের এই সময়টা রাখা-ই হয়েছে সালিশের মাধ্যমে সমঝোতার সুযোগ দিতে।
তালাকের পর আবার বিয়ে করতে বাধা আছে?
তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রীকে ইদ্দত শেষে অন্যত্র বিয়েতে বাধা নেই। তালাকপ্রাপ্ত দম্পতি পুনরায় নিজেদের মধ্যে বিয়ে করতে চাইলেও আইনে সরাসরি বাধা নেই — মাঝে তৃতীয় বিয়ের (হিলা) শর্ত আইন স্বীকার করে না।
তথ্যসূত্র ও আইনি রেফারেন্স
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ৭
- মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯
- মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪
আরও পড়ুন
লেখাটি শেয়ার করুন, লেখকের পরিচয় দেখুন এবং একই বিষয়ের আরও গাইড পড়ুন।
লেখকের পরিচিতি

লেখক
শান্ত ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক · এলএল.বি — BAUET · এলএল.এম — BUP
শান্ত ইসলাম বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BAUET) থেকে এলএল.বি এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে এলএল.এম সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের আইন, সরকারি সেবা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সহজ বাংলায় লেখালেখি করেন — লক্ষ্য একটাই, জটিল আইনি বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলা।
সম্পর্কিত
সম্পর্কিত লেখা
একই বিষয়ের দরকারি গাইড
মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের নিয়ম — কাবিননামা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন কীভাবে হয়, কাজী অফিসের ফি কত, কাবিননামায় কী লেখা থাকে এবং নিবন্ধন না করলে কী ঝুঁকি — সহজ বাংলায় পূর্ণাঙ্গ গাইড।
দেনমোহর কী, কত টাকা, কখন দিতে হয়? স্ত্রীর আইনি অধিকারের পূর্ণ ব্যাখ্যা
দেনমোহর স্ত্রীর আইনি পাওনা — মুয়াজ্জল ও মুওয়াজ্জল দেনমোহরের পার্থক্য, তালাকের পর আদায়ের নিয়ম, মামলার সময়সীমা ও পারিবারিক আদালতের প্রক্রিয়া সহজ বাংলায়।
ভরণপোষণের আইন: স্ত্রী ও সন্তান কত টাকা, কীভাবে পাবেন?
স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ কার দায়িত্ব, কত টাকা ন্যায্য, স্বামী না দিলে পারিবারিক আদালতে মামলার নিয়ম, তালাকের পর ইদ্দতকালের ভরণপোষণ — পূর্ণ ব্যাখ্যা।